ড. আকবর আলি খানের "বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্য: একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ" গ্রন্থটি মূলত পূর্ববঙ্গে ইসলামের অভাবনীয় প্রসারের সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধানের একটি বৈজ্ঞানিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রয়াস। ১৮৭২ সালের প্রথম আদমশুমারিতে বাংলার পূর্বাঞ্চলে বিপুল মুসলিম জনসংখ্যার যে চিত্র উঠে আসে, তার পেছনে প্রচলিত চারটি তত্ত্ব—বলপ্রয়োগ বা তলোয়ার তত্ত্ব, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা তত্ত্ব, সামাজিক মুক্তি বা বর্ণপ্রথা তত্ত্ব এবং বহিরাগত অভিবাসন তত্ত্ব—কেন ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার নিরিখে অসম্পূর্ণ, লেখক তা অত্যন্ত যুক্তি খণ্ডনের মাধ্যমে বইয়ের প্রথমাংশে দেখিয়েছেন। তিনি যুক্তি দেন, যদি তলোয়ার বা রাজকীয় সুবিধার জোরেই ধর্ম পরিবর্তন হতো, তবে মুসলিম শাসনের কেন্দ্রস্থল দিল্লির আশেপাশে বা পশ্চিমবঙ্গের রাজধানীগুলোর নিকটে মুসলিম জনসংখ্যা বেশি হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেছে রাজধানী থেকে দূরবর্তী পূর্ববঙ্গে, যেখানে অধিকাংশ মুসলমানই ছিলেন প্রান্তিক ও দরিদ্র কৃষক।
এই ঐতিহাসিক ধাঁধার সমাধানে ড. আকবর আলি খান ভৌগোলিক পরিবর্তন ও কৃষি সম্প্রসারণের একটি নতুন ও গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন। মধ্যযুগে বাংলার নদীগুলোর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে পূর্ববঙ্গে বিস্তীর্ণ উর্বর পলিমাটির সৃষ্টি হয় এবং বিশাল জঙ্গলময় অঞ্চলের উদ্ভব ঘটে। এই সময়ে সুফি-সাধক ও পীরেরা কেবল ধর্মের বাণী নিয়েই আসেননি, বরং তাঁরা ছিলেন মূলত এক একজন কৃষি উদ্যোক্তা। তাঁরা স্থানীয় আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষদের সাথে নিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে নতুন নতুন মানব বসতি এবং কৃষিকাজের সূচনা করেন। জীবন ও জীবিকার এই যুগান্তকারী রূপান্তরের প্রক্রিয়ায়, সুফিদের মানবিক আচরণ ও অর্থনৈতিক নেতৃত্বে মুগ্ধ হয়ে স্থানীয় নদীভাঙা ও বনাঞ্চলের মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে। পরিশেষে লেখক দেখিয়েছেন, বাংলায় ইসলামের এই সাফল্যের পেছনে কোনো রাজনৈতিক শক্তি কাজ করেনি; বরং পূর্ববঙ্গের অনন্য ভৌগোলিক পরিবেশ, কৃষির বিকাশ এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে সুফি-সাধকদের মেলবন্ধনের ফলেই ইসলাম এখানে এক বিরাট সামাজিক রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল