শ্রী ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'বাঙ্গালার বেগম' গ্রন্থটি নবাবী আমলের বাংলার ইতিহাসের এক অনন্য দলিল, যেখানে অন্দরমহলে থাকা প্রভাবশালী নারীদের জীবন ও রাজনীতিতে তাঁদের ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। ১৯১৩ সালে প্রথম প্রকাশিত এই গ্রন্থটি মূলত বাংলার ছয়জন প্রভাবশালী বেগমের— লুৎফুন্নিসা, আমিনা, আলিবর্দী বেগম, মণিবেগম, ঘসেটি এবং জিন্নতুন্নিসার— জীবনগাথা, সংগ্রাম ও সংকটকে ইতিহাসের পাতায় নতুন করে জীবন্ত করে তুলেছে। লেখক অত্যন্ত যত্নের সাথে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র ও রেকর্ড ঘেঁটে এই নারীদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও মহিমা তুলে ধরেছেন।
বইটির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রধানা বেগম লুৎফুন্নিসার আত্মত্যাগ ও পতিভক্তির করুণ কাহিনী। সাধারণ এক ক্রীতদাসী থেকে সিরাজের হৃদয়ের রানী হয়ে ওঠা লুৎফুন্নিসা ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে স্বামীর পতনের পর চরম দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হন। সিরাজের মৃত্যুর পর তাঁকে ঢাকায় নির্বাসিত করা হয় এবং পরবর্তীতে মুর্শিদাবাদের খোশবাগে স্বামীর কবরের পাশে একাকী ও রিক্ত অবস্থায় দিন কাটাতে হয়। তাঁর এই অটল প্রেম ও ভক্তির কথা আজও ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে স্বীকৃত।
গ্রন্থটিতে সিরাজের জননী আমিনা বেগমের চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং আলিবর্দী খাঁ-র জ্যেষ্ঠা কন্যা ঘসেটি বেগমের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সিরাজের সাথে তাঁর বিরোধের কাহিনীও সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া মণিবেগম, যিনি 'মাদার-ই-কোম্পানি' হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাঁর রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা এবং দানশীলতার পরিচয়ও এখানে পাওয়া যায়। নবাবী আমলের ইতিহাসকে পূর্ণতা দিতে এই নারী চরিত্রগুলোর অবদান অনস্বীকার্য, যা ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর লেখনীর মাধ্যমে সাধারণ পাঠকের কাছে অত্যন্ত সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে পৌঁছে দিয়েছেন।