ইতিহাস নিজে নিজে কথা বলে না, ক্ষমতাশালীরা ইতিহাসের বিবরণ খাড়া করে। ডিসেম্বর ২০২২-এ প্রকাশিত Bangladesh in 1971: Genocide of Whom and by Whom শীর্ষক প্রবন্ধে আমরা দেখিয়েছিলাম যে, ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রভাবশালী বয়ান, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অফিসিয়াল মতাদর্শে পরিণত হয়- তা বাছাই করা কিছু স্মৃতিকথন, রাজনৈতিক স্বার্থে নির্দেশিত গ্রন্থনা এবং ভিন্নমতের কণ্ঠস্বরকে পরিকল্পিতভাবে দমনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছিলো।'
২০২৪ সনের জুলাই বিপ্লব/গণ অভ্যুত্থান বাংলাদেশে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন ঘটিয়েছে। এই সুবাদে সেই পুরোনো ঐতিহাসিক ক্ষতগুলো উন্মোচিত হয়েছে এবং ১৯৭১ সালের ঘটনাবলি কীভাবে স্মরণ করা হবে, কীভাবে বর্ণিত হবে এবং কীভাবে তার ওপর চিন্তাভাবনা করা হবে- সে বিষয়ে নতুন ও মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ হলো অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের মন্তব্য। তিনি বলেছিলেন,
জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের দ্বারা সংঘটিত বর্বরতা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এই মন্তব্যের পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়। এই ঘটনাটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, 'বাঙালির চেতনা', 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা' এবং 'একাত্তরের চেতনা'- এই ধারণাগুলো গত অর্ধশতাব্দী ধরে কীভাবে রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগীয় বাতাবরণ দিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে লালিত ও সংরক্ষিত হয়েছে।
২০২৪ সনের জুলাই বিপ্লব জাতীয়তাবাদী বয়ান সম্পর্কে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। বাঙালিরা দীর্ঘ সংগ্রাম করে একবার স্বাধীনতা অর্জন করলো। তারপর কেন একই জনগোষ্ঠী পঁচিশ বছরেরও কম সময়ে আবার স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে বাধ্য হলো? এই প্রশ্ন রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদী বয়ানের ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জ করে।
এর ফলে আরও কিছু গভীর প্রশ্ন সামনে আসে। কে ইতিহাসের নির্মাতা? কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তা ব্যবহৃত হয়? কোন ভয়েসগুলো উচ্চারিত হয় এবং কোনগুলোকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয় এবং কেন? একটি জাতির স্মৃতিচিত্র কি কৃত্রিম সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে?