বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উম্মাহর একাত্মতা ও সফলতার পেছনে জবানের ভূমিকা অপরিসীম। এর মাধ্যমে ভালো কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ সম্পন্ন হয়। আর এটি যদি উম্মাহর স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার হয়, তাহলে এটি ব্যক্তি ও সমাজে জন্ম দেয় বিভেদের। জবানের বহুবিধ ভয়াবহতা রয়েছে যার নেতিবাচক প্রভাবে শুধু ইসলামী সমাজই নয়, মানুষের পারিবারিক ও ব্যক্তিজীবনও এর ফলে চরমভাবে বিপন্ন হতে পারে। এর প্রভাবেই স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিভেদ তৈরি হয়, ভাই ভাইয়ের শত্রুতে পরিণত হয়, বন্ধুত্বে ধরে ফাটল। এমনকি সম্রাজ্য হয়ে যায় বিলীন।
ইমাম নববি বলেন, প্রত্যেক বোধসম্পন্ন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য অহেতুক কথাবার্তা থেকে জবানের হিফাজত করা আবশ্যক। যেসব কথায় লাভ-ক্ষতি উভয়টি সমান এমন কথা থেকে নিবৃত্ত থাকা সুন্নত। কেননা, কখনো কোনো কোনো বৈধ কথাও মানুষকে হারাম বা মাকরুহ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কোনো ব্যক্তির ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো অনর্থক আচরণ ত্যাগ করা।
কবি কত চমৎকার বলেছেন, হে মানব! নিজের জবানের হেফাজত কর। এটি বিষধর সর্প, তোমাকে যেন দংশন না করে। বহু মানুষ নিজের জবানের দংশনে কবরে পৌঁছেছে। যার সামনে বড় বড় বীরেরাও দাঁড়াতে হিম্মত করত না।
মানুষকে আল্লাহ তাআলা অনন্য সৃষ্টিকুশলতার মিশ্রণে সৃষ্টি করেছেন। তিনশত ষাট জোড়া হাড়ের ওপর ত্বক ও রক্ত-মাংসের যে প্রলেপ দিয়ে তিনি এই মানবদেহ গঠন করেছেন, সেই মানবদেহটি একটি অপূর্ব বিস্ময়ের সমষ্টি। দেহের এই সমষ্টি গঠিত হয়েছে অপরূপ কিছু অঙ্গসৌষ্ঠবের নান্দনিক মিলনে। আর এই সুন্দর সুনিপুণ মানবদেহের সবচেয়ে অপরিহার্য অঙ্গটি হলো মানুষের মুখ ও তন্মধ্যকার রসনা। মুখের ব্যবহার বহুবিধ। রসনা-সিক্ত মানুষের ভাষাই সৃষ্টিকুলের মধ্যে মানবজাতিকে করেছে সম্পূর্ণ আলাদা, বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ও আভিজাতের অধিকারী। পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে বহুগুণ শক্তিধর অনেক প্রাণী আছে, কিন্তু তাদের ভাষাশৈলী নেই বলে মানুষের কাছে তারা পদানত। মানুষ তার ভাষার জোরেই করেছে জগত জয়, অন্য সৃষ্টিকে করেছে পদানত। ভাষার কল্যাণেই মানুষ হয়েছে বিভক্ত নানা গোত্রে, নানা রাষ্ট্রে এবং নানা প্রাসাঙ্গিক বিভাজনে। ভাষার কল্যাণেই বহু মানুষ হয়েছে স্রষ্টার নাফরমান, ইবলিশ ও ফেরাউনের মতো ঔদ্ধ্যত এবং কিছু মানুষ ভাষার বিনম্র সতত ব্যবহারে স্রষ্টার অস্তিত্ব স্বীকার করে হয়েছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ। ভাষা মানুষকে মানষত্বের পরিচয় এনে দিলেও শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দিয়েছে এর সদ্ব্যবহারে। তাই কোরআন-হাদিসে ভাষা ও রসনার সংযমী ব্যবহারের গুরুত্ব এসেছে। পরকালে মানুষের অসংযত ভাষার ব্যবহারই তাকে অধোঃমুখো করে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করবে বলে হুঁশিয়ারী এসেছে। পরকালবিশ্বাসী মানুষের প্রধানতম দায়িত্ব হলো ভাষার সংযম ও মুখের ওপর লাগাম টেনে দেয়া। এই বিষয়ে হাদিসে অনেক তাগাদা এসেছে। সালফে সালেহিনগণ এর গুরুত্বের বিবরণ দিয়ে অনেক গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। তাঁদের অন্যতম হলেন ইমাম ইবনু আবিদ দুনিয়া রহ., যিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস এবং সমাজনির্মাতা। সমাজের অধঃপতনের কারণগুলো চিহ্নিত করে তিনি যেসব অমর গ্রন্থ জাতিকে উপহার দিয়ে গেছেন তার অন্যতম হলো الصمت وآداب اللسا ‘মুখের ওপর লাগাম দিন’ নামের অনন্য অসাধারণ গ্রন্থটি। গ্রন্থটির অনূদিতরূপকে পাঠকের টেবিলে তুলে দিচ্ছি। বইটি আশা করি পাঠকহৃদয়কে আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে।
আল্লাহ তাআলা যত জায়গায় তাঁর ইবাদতের হুকুম দিয়েছেন, ততো জায়গায় একই সঙ্গে পিতা-মাতার প্রতি সদাচারের হুকুমও দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদাত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়ে-ই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল। -সূরা বনি ইসরাইল (১৭) : ২৩।
মুফাসসিরগণ বলেন, আল্লাহ তাআলার নির্দেশ বাস্তবায়নের সাথে সাথে পিতা-মাতার অধিকার বাস্তবায়ন করাও অত্যাবশ্যক। বার্ধক্যে—বিশেষত তাদের সামনে ‘উফ’ পর্যন্ত উচ্চারণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। তাদেরকে হুমকি-ধমকি দেওয়াও নিষিদ্ধ। বার্ধক্যে তাঁরা দুর্বল, নিস্তেজ ও অসহায় হয়ে পড়েন। বিপরীতে সন্তানগণ হয়ে থাকে সবল ও উপার্জনোক্ষম। তাছাড়া তারুণ্যের উচ্ছলতা ও উন্মত্ত উচ্ছাস আর বার্ধক্যের শীতলতা ও উত্তেজনাপূর্ণ অভিজ্ঞতায় দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এটি অত্যন্ত নাজুক পর্যায়। তাই ঐ অবস্থায় পিতা-মাতার প্রতি শিষ্টাচার-ভদ্রতা, সম্মান-মর্যাদা প্রদর্শনের প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা এবং সর্বাবস্থায় তাদের খেদমত ও আনুগত্য করা সন্তানদের জন্য বাধ্যতামূলক কর্তব্য। বইটি মা-বাবার গল্পে আঁকা এক অথৈ সমুদ্র। মা-বাবার সাথে ঘটে যাওয়া অনেক ভয়াবহ ঘটনার বিবরণ দেওয়া হয়েছে এই বইয়ের পাতায় পাতায়। পুরো বইয়ে লেখক মনের মাধুরি মিশিয়ে স্মৃতিচারণ করতে করতে অগ্রসর হয়েছেন। জীবন বদলে দেওয়ার মতো খোরাক বপন করে গেছেন। এইসব ঘটনা শুধু পড়ে গেলেও তন্ময়তায় হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠবে, চিন্তার সাগরে অবগাহন করার অনুভূতি জাগ্রত হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ কবুল করুন! আমীন!