যিলহজের প্রথম দশক
এই দশ দিনে অনেক বড় বড় ইবাদতের সম্মিলন ঘটেছে, অন্য দিনগুলোর ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। সেগুলো হলো হজ ও কুরবানি, আরাফা এবং তালবিয়ার দিন। পাশাপাশি নামাজ, রোজা, দান-সদাকা তো আছেই। এই দিনগুলোতে ইবাদত করা অন্যান্য দিনগুলোর ইবাদতের তুলনায় অনেক বেশি ফজিলতপূর্ণ। এই দিনগুলোতে নামাজ, রোজা, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির, দুআ, আল্লাহ তাআলার কাছে কাকুতি-মিনতি করা, মাতা-পিতার সাথে সদাচার করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা, অসুস্থদের দেখতে যাওয়া, জানাযার অনুসরণ করা, প্রতিবেশীর প্রতি অনুগ্রহ করা, ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ানো ইত্যাদি সব ইবাদত অন্যান্য দিনগুলোর চেয়ে বেশি উত্তম।
কুরবানি নিয়ে যত প্রশ্ন
ধর্ম বলবে মমতার কথা,দয়ার কথা। এ কেমন ধর্ম,যা প্রাণ হত্যার কথা বলে? ঠিক আছে,প্রাণী হত্যা করা যাবে; কিন্তু প্রাণ হত্যা করে উৎসব কেন! কারও জীবন কেড়ে নিয়ে উৎসব — এটা কেমন নৈতিকতা! ইসলাম কত নির্মম ধর্ম,কত অমানবিক! মানবিক মানে ‘যা মানুষের মানায়’। অমানবিক মানে ‘মানুষের যা মানায় না’,’যা মানুষের করা উচিত না’। তার মানে,প্রাণীকে হত্যা করা মানুষের মানায় না,মানুষ হিসেবে এটা করা উচিত না। এসব প্রশ্ন যারা করে তাদের মূল উদ্দেশ্য ইসলামের বিরোধিতা করা। এদের নিজেদের কোনো স্থিরতা নেই। এরা দাবি করে নিজেরা বিবিজ্ঞাননমননস্ক,অথচ এদের উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধে গেলে বিবিজ্ঞানকেও আর গুণবে না।
দলিলসহ কুরবানীর মাসায়েল
কুরবানী—আল্লাহ তাআলার জন্য আত্মত্যাগের এক অনুপম দৃষ্টান্তের নাম। যার সূচনা করেছিলেন সাইয়েদুনা হযরত ইবরাহীম ও হযরত ইসমাইল আলাইহিমুস সালাম।
আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কুরবানী করার আদেশপ্রাপ্ত হওয়ার পর ইবরাহীম আ. প্রিয় বস্তুটি নির্ধারণে দোদুল্যতায় ভুগছিলেন—কোন সে প্রিয় জিনিস! যার কুরবানী করার কথা আল্লাহ তাআলা বারবার বলছেন আমায়! কিন্তু যখন বুঝতে পারলেন, প্রিয় বস্তুটি আর কিছুই নয়; বার্ধক্য বয়সে আল্লাহর দেয়া শ্রেষ্ঠ উপহার ইসমাইলকেই কুরবানী দেয়ার কথা বলা হচ্ছে আমায়। তখন আল্লাহর আদেশ পালনে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠা করেননি।
আর এদিকে বালক ইসমাইল আ.-ও যেন তখন থেকেই নবীসুলভ আচরণ করছিলেন। পিতার কুরবানীর কথা শোনার পর তিনি একবাক্যে বলে ফেলেন,
یٰۤاَبَتِ افۡعَلۡ مَا تُؤۡمَرُ ۫ سَتَجِدُنِیۡۤ اِنۡ شَآءَ اللّٰهُ مِنَ الصّٰبِرِیۡنَ
বাবা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তা-ই করুন, ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈযশীলদের অন্তুর্ভুক্ত পাবেন।
পিতা-পুত্রের আত্মত্যাগের এই অনুপম দৃষ্টান্ত জগতে তুলনাহীন।
আল্লাহ তাআলা শুধু পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন, আর তাঁরা দুজনেই এতে রাজি হয়ে গেলেন! ইসমাইল আ.-কে আর কুরবানী হতে হয়নি; বরং জবাইয়ের ঠিক আগ মুহূর্তেই আল্লাহ তাআলা জিবরীল আ. এর মাধ্যমে জান্নাতী দুম্বা পাঠিয়ে দেন।
কিন্তু এই ঘটনা এখানেই শেষ হয়ে যায়নি, বরং একে আল্লাহ তাআলা কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির দৃষ্টান্ত বানিয়ে রেখেছেন। এবং এই ঘটনা যাতে বিস্মৃত না হয়ে যায় এজন্য কেয়ামত পর্যন্ত কুরবানীর বিধান জারি করে দিয়েছেন। ফলে যতদিন কুরবানী হবে ততদিন সবার মুখে মুখে পিতা-পুত্রের এই আত্মত্যাগের কথা জারি থাকবেই।
কিন্তু পশু শুধু জবাই করলেই হবে না, এই কুরবানী বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য কিছু নিয়মনীতি রয়েছে, কুরবানীর ক্ষেত্রে যেগুলোর অনুসরণ না করলে পুরো কুরবানীই বৃথা যাবে। কেউ কেউ এসব মাসআলা-মাসায়েল একেবারেই না-জানার কারণে তার কুরবানী বিশুদ্ধ হয় না, আবার কেউ কেউ ভুল জানার কারণে সেও একই অবস্থায় পতিত হয়।
তাই আমরা এ বইয়ে কুরবানী ও আকীকার বিস্তারিত মাসায়েল উল্লেখ করার চেষ্টা করেছি। বইয়ের শুরুতে জিলহজ মাসের গুরুত্ব, করণীয় ও ফজিলত দলিলসহ তুলে ধরা হয়েছে। এরপর প্রত্যেক মাসআলা সহজ ও সাবলীলভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, পাশাপাশি আমরা প্রত্যেক মাসআলায় একাধিক দলিল উল্লখে করার চেষ্টা করেছি। কুরবানীর ক্ষেত্রে আধুনিক কিছু সমস্যার সমাধানও বইয়ে তুলে ধরা হয়েছে।
আহকামে কুরবানি
উপমহাদেশের বরেণ্য ফকিহ, প্রখ্যাত মুফতি, মুহাম্মাদ আবদুস সালাম চাটগামি রহ. রচিত একটি তথ্যবহুল গ্রন্থ। ক্ষুদ্র কলেবরের এই গ্রন্থটিতে সন্নিবেশিত হয়েছে কুরবানি, আশুরা, আকিকা, জবেহ ও মানতের নিখুঁত ও নির্ভুল বিধানাবলি। দলিলসহ প্রতিটি মাসআলা উপস্থাপন করা হয়েছে সম্পূর্ণ ফিকহি ও তাহকিকি ধাঁচে। মানতের কুফল এবং এজাতীয় সামাজিক কুপ্রথা নিয়েও জরুরি আলাপ টেনেছেন গ্রন্থকার। বলা যায়, বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে লেখক সাগরকে সংকুচিত করে ছোট্ট পাত্রে এঁটে দিয়েছেন।
কুরবানী ও আকিকা
ইদুল আজহা ও কুরবানি আমাদের জীবনে মহান বার্তা বয়ে আনে। ত্যাগ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি তালাশ সবকিছুর উর্ধ্বে, এই শিক্ষার স্মরণিকা হিসেবে মুমিনের জীবনে প্রতি বছর এই ইবাদতের আগমন ঘটে। তাই ইবাদত হিসেবে এর বিশুদ্ধতা বজায় রাখা আমাদের কর্তব্য। এই ইবাদতের মাহাত্ম্য, গুরুত্ব এবং সঠিক পদ্ধতি জানা আমাদের জন্য আবশ্যক।
তাই এ বিষয়ক ইলম শেখার দায়িত্ব পালন, বিশেষত কুরবানি সংশ্লিষ্ট ইবাদতের সময় ঘনিয়ে আসায় মুফতি তাকি উসমানী হাফি. এবং মুফতি মুহাম্মাদ সালমান মনসুরপুরী হাফি.-এর গুরুত্বপূর্ণ কিছু লেখার অনুবাদ নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘ফাজায়েল ও মাসায়েল : কুরবানি ও আকিকা’ বইটি। আকিকাও আমাদের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। নবজাতকদের হক। যেহেতু এখানেও পশু জবাইয়ের বিষয় রয়েছে, সুতরাং কুরবানির সাথে আকিকার আলোচনা চলে আসাও খুবই প্রাসঙ্গিক।
সার্বিক দিক সামনে রেখে সঞ্জীবন প্রকাশন সাইদুর রহমান জালালপুরী হাফি. এবং Abu Midfa Saiful Islam হাফি.-এর চমৎকার কলমে অনুবাদকর্মটি প্রকাশ করতে যাচ্ছে।
উদাহরণত বইটির বিষয়সূচিতে পাচ্ছেন : কুরবানি, হজ ও জিলহজের ১০ রাত, উক্ত রাতগুলোর ফজিলত, এই দিনগুলোর বিশেষ আমল, কুরবানির সময় ও বিবিধ, , কুরবানি কার ওপর ওয়াজিব এবং কেন সহ এ জাতীয় অনেক জিজ্ঞাসার জবাব, ত্রুটিযুক্ত প্রাণীর বিভিন্ন ধরন ও সেসবের মাঝে কোনটি কুরবানির উপযুক্ত আর কোনটি উপযুক্ত নয়, কুরবানিতে জবাইয়ের আদব ও অবশ্যই জানা উচিত ধরনের বিভিন্ন মাসয়ালা, এবং শেষ অধ্যায়ে আকিকার বিস্তারিত আলোচনা।
মাত্র ৯৫ পৃষ্ঠার ছোট্ট কলেবরের বইটি হতে পারে আপনার একবসায় কুরবানির ইবাদত শেখার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।