ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসশাস্ত্রে জ্ঞান লাভ করার পর একটি নির্ভরযোগ্যে হাদীস গ্রন্থ সংকলন করেন| জামি‘ আত& তিরমিযী- তাঁর অনবদ্য রচনা| হাদীসের যতগুলো কিতাব রয়েছে তন্মধ্যে জামি‘ আত্ তিরমিযীর অনন্যতায় অদ্বিতীয়| ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু ‘ঈসা (রহিমাহুল্লাহ) প্রণীত জামি‘ আত্ তিরমিযী একটি অতুলনীয়, বিশ্বব্যাপী সমাদৃত, প্রসিদ্ধ এবং অত্যন্ত উঁচুমানের একটি হাদীস গ্রন্থ|
শায়খুল ইসলাম হাফিয ইমাম আবূ ইসমা‘ঈল আবদুল্লাহ আল আনসারী (মৃ. ৪৮১ হি.) তিরমিযী সম্পর্কে বলেছেন, আমার দৃষ্টিতে জামি‘ আত্ তিরমিযী বুখারী ও মুসলিম গ্রন্থদ্বয় অপেক্ষা অধিক ব্যবহারোপযোগী| কেননা বুখারী ও মুসলিম এমন হাদীস গ্রন্থ শুধু বিশেষ পারদর্শী ‘আলিম ছাড়া অন্য কেউ তা থেকে ফায়দা লাভ করতে পারে না| কিন্তু ইমাম আবূ ‘ঈসা তিরমিযীর গ্রন্থ থেকে যে কেউ ফায়দা গ্রহণ করতে পারে| প্রাধান্য মত অনুসারে সুনানুন& নাসায়ী ও আবূ দাঊদ-এর পর এ হাদীস গ্রন্থটির অবস্থান|
ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর তিরমিযীতে মোট ৪৬টি অধ্যায় ও ২১১৪ পরিচ্ছেদে ৩৯৫৬টি হাদীস সন্নিবেশিত হয়েছে| এ জামি‘ গ্রন্থটিতে হাদীসের পুনরুল্লেখ খুবই কম হয়েছে| ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে হাদীস নির্বাচন করেছেন|
ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর এ কিতাবের হাদীসগুলোকে ‘ইলমে ফিক্বহের ধারাবাহিকতায় বিন্যাস করা হয়েছে| ফিক্বহের ধারায় বিন্যাস করায় উম্মাতের মধ্যে এর গ্রহণযোগ্যতা বহু মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে| জামি‘ আত্ তিরমিযীর ধারাবাহিক ও বিন্যাস খুবই চমৎকার| এর থেকে হাদীস খুঁজে বের করা খুবই সহজ|
ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) সব মুজতাহিদের মৌলিক দালীলিক হাদীসগুলোকে একত্রিত করেছেন| তিনি স্বীয় কিতাবে ফাক্বীহদের মতামত উল্লেখ করেছেন| যার ফলে এটি হাদীসের কিতাব হওয়া সত্ত্বেও ‘ইলমে ফিক্বহের ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে| এছাড়াও তিনি হাদীসসমূহ দলীলভিত্তিক বর্ণনা করেছেন এবং সানাদ সম্পর্কে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন|
ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) প্রত্যেক পরিচ্ছেদের শুরুতে এমন একটি, দুটি অথবা তিনটি হাদীস সংকলন করেছেন, যেগুলো অন্য কোনো ইমাম থেকে সংকলিত হয়নি| অতঃপর তিনি ‘ওয়াফিল বা-বি’ বলে বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য হাদীস সংকলন করেছেন| তাঁর এই ‘ওয়াফিল বা-বি’-এর ওপর অনেকেই স্ততন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন|
এ কিতাবে এমন হাদীসগুলোকে স্থান দিয়েছেন, যার প্রতি কোনো না কোনো বিদ্বান ‘আমাল করেন| অর্থাৎ ‘আমালযোগ্য হাদীসগুলোকেই তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন|
ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) এ মূল্যবান হাদীস গ্রন্থে হাদীসগুলোর মাঝে সমন্বয় সাধন করে তা একত্রিত করেছেন| ‘ইলালুল হাদীস বা হাদীসের ত্রুটি, হাদীসের হুকুম, মতভেদ, মতভেদের মধ্য থেকে মুহাদ্দিসের নিকট প্রাধান্য মত, যেমন- ইমাম বুখারী ও অন্যান্যদের মত এনেছেন| এ কিতাবটি চমৎকারভাবে সাজানো, তাকরার হাদীস কম, মাযহাবগুলোর মতামত ও বিভিন্ন দলীল উল্লেখ রয়েছে| আর হালাল-হারামের ক্ষেত্রে কোনো য‘ঈফ ও জাল হাদীস নিয়ে আসা হয়নি|
ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) সন্দেহপূর্ণ বর্ণনার ক্ষেত্রে রাবীর নাম, উপনাম, উপাধি ইত্যাদি বর্ণনা করেছেন, যাতে কোনো সন্দেহ অবশিষ্ট না থাকে|
গ্রন্থটির প্রকাশনা বৈশিষ্ট্য :
এ গ্রন্থটি সুনানে আরবা‘আর একটি গ্রন্থ হওয়া সত্ত্বেও তা “জামি‘ আ্ তিরমিযী” নামে পরিচিতি| বহুমুখী ও নানাবিধ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে কিতাবটি সর্বমহলে সমাদৃত| শত শত বছর ধরে দারসিয়্যাতের অঙ্গনে কিতাবটির মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা বরাবরের মতোই অনন্য| অপূর্ব এই মাকবুলিয়্যাত, নিরুপম বৈশিষ্ট্য আর স্বতন্ত্র স্বকীয়তার ফলে যুগে যুগে প্রাজ্ঞ ও বিদগ্ধ ‘আলিমদের বড় একটি দল কিতাবটির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে কলম ধরেছেন|
এ কিতাবের হাদীসগুলো প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য সহজে বোধগম্য ও উপকৃত হবার উপযুক্ত|
এ কিতাবের হাদীসগুলো বিশেষ ˆবশিষ্ট্যমণ্ডিত করে সাজানো হয়েছে এভাবে— মূল হাদীস তিরমিযী’র ক্বওল ও অন্যান্য স্কলারদের মাসআলাহ&-মাসায়িল তাখরীজ তাহক্বীক্ব বিরোধপূর্ণ তাহক্বীক্ব সমস্যার সমাধান ব্যাখ্যা| আর প্রতিটি হাদীস থেকেই ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ)-এর ক্বওলগুলো ভিন্ন প্যারায় রাখা হয়েছে| এতে করে পাঠকবৃন্দ সহজেই মূল হাদীস দেখে নিতে পারবে|
এই প্রথম একটি হাদীসের কিতাব যাতে প্রতিটি হাদীস সম্পর্কে একসাথে তিনজন প্রখ্যাত মুহাক্কিক্বের তাহক্বীক্ব সন্নিবেশিত করা হয়েছে যা এ পর্যন্ত কোনো কিতাবে প্রকাশিত হয়নি— জগদ্বিখ্যাত মুহাক্কিক্ব এবং বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ও বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস রিজালশাস্ত্রবিদ ‘আল্লামাহ& মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহিমাহুল্লাহ), আরেক জগদ্বিখ্যাত মুহাক্কিক ও হাদীসবিশারদ, উলূমুল হাদীসশাস্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্টদের অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তিত্ব ‘আল্লামাহ& শায়খ শু‘আয়ব ইবনু মুহাররম আল আরনাঊত আল হানাফী (রহিমাহুল্লাহ) এবং দা‘ঈ, ধর্মতত্ত্ববিদ, ইসলামী পণ্ডিত ও তাহক্বীক্ব গবেষণার অনবদ্য সংস্কারমনা শায়খ যুবায়র ‘আলী যাঈ (রহিমাহুল্লাহ)|
এছাড়াও যেসব তাহক্বীক্বে মুহাক্কিক্বগণ সানাদ ও মাতানগত দ্বিমত পোষণ করেছেন, তার একটি সুষ্ঠু ও গবেষণালব্ধ (কলেবরে বৃদ্ধির কারণে) সংক্ষিপ্ত তাহক্বীক্ব দ্বারা এ বিরোধ সমস্যার সমাধান করা হয়েছে|
হাদীসের তাখরীজ সংকলন করা হয়েছে- নাসিরুদ্দীন আলবানী, যুবায়র ‘আলী যাঈ ও শু‘আয়ব আল আরনাঊত-এর সংকলিত “জামি‘ আত্ তিরমিযী”, তুহফাতুল আহ&ওয়াযী (তিরমিযীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ), রিসালাহ& পাবলিশার্স (লেবানন)-এর “সুনানুত্ তিরমিযী”, দারুত্ তাসীল (লেবানন)-এর “সুনানুত্ তিরমিযী ওয়াল জামি‘উল কাবীর” এবং জামি‘ আত্ তিরমিযী (উর্দু ভাষ্য : নোমানী কুতুবখানা, লাহোর, পাকিস্তান) ইত্যকার গ্রন্থ থেকে|
প্রতিটি দুর্বল হাদীসের কারণ বর্ণনা করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে|
হাদীসের শব্দবিন্যাস প্রকাশনাভেদে ভিন্নতার দরুন এই জটিল সমস্যার সমাধানে সহযোগিতা নেয়া হয়েছে— কুরআন-হাদীসের সার্চ সফটওয়্যার বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থসম্ভার “মাকতাবাতুশ্ শামিলাহ্”, অনলাইনভিত্তিক হাদীসের গ্রন্থাগার sunnah.com এবং মারকাযুল বুহূস ওয়া নাক্বদিল মা‘লূমাত-এর গবেষণায় দারুত্ তাসীল (লেবানন)-এর “সুনানুত্ তিরমিযী ওয়াল জামি‘উল কাবীর” হতে|
কলেবরে বৃদ্ধির কারণে গুরুত্বপূর্ণ ও বাছাইকৃত অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হাদীসের ব্যাখ্যা সংযোজন করা হয়েছে|
নাসিরুদ্দীন আলবানী ও যুবায়র ‘আলী যাঈ-এর হাদীসের নম্বরের সাথে ইমাম শু‘আয়ব আল আরনাঊত-এর নম্বরের মিল না থাকায় পাঠকদের সুবিধার্থে শু‘আয়ব আল আরনাঊত-এর নম্বর [] ব্রাকেটের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে|
সংক্ষেপে বলতে গেলে- সহীহ হাদীসের জ্ঞান অর্জন ও দৈনন্দিন জীবনে তার প্রয়োগ এবং ইসলামী ফিক্হ বা আইনশাস্ত্র সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভের জন্য এই কিতাবটি সবার জন্য একটি অপরিহার্য নির্দেশিকা হতে পারে|