উলামায়ি কিরাম ‘মুওয়াত্ত্বা মালিক’-কে এমন মর্যাদা দিয়েছেন যে, অনেকেই একে কুরআনুল মাজীদের পরে রচিত শ্রেষ্ঠ গ্রন্থসমূহের অন্যতম বলে উল্লেখ করেছেন| যদিও পরবর্তীকালে সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিম-এর মতো বিশুদ্ধ হাদীসগ্রন্থ সংকলিত হয়েছে, তবুও ইসলামী জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে ‘মুওয়াত্ত্বা মালিক’ আজও তার স্বতন্ত্র মর্যাদা ধরে রেখেছে|
ইসলামী জ্ঞানভাণ্ডারের অন্যতম প্রাচীন, নির্ভরযোগ্য ও বারাকাতময় গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘মুওয়াত্ত্বা মালিক’ একটি বিশেষ স্থান অধিকার রয়েছে| হাদীস ও ফিকহশাস্ত্রের সমন্বয়ে রচিত এই গ্রন্থ যুগ যুগ ধরে ‘উলামায়ে কিরাম, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের নিকট সমাদৃত হয়ে আসছে|
গ্রন্থটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—এতে ‘ইবাদাত, লেনদেন, পারিবারিক জীবন, ˆনতিকতা, বিচারব্যবস্থা এবং সামাজিক বিষয়াবলি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে অধ্যায়ভিত্তিক উপস্থাপন করা হয়েছে| বিশেষত মাদীনার ‘আমাল ও সুন্নাহর সংরক্ষণে এ গ্রন্থের ভূমিকা অনন্য|
ওয়াহ&ব ইবনু খালিদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন : “পূর্ব ও পশ্চিমে রসূলুল্লাহ (স.)-এর হাদীস বিষয়ে ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) অপেক্ষা বেশি নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি আর কেউ ছিলেন না|”
ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন : “কোনো হাদীসের কোনো অংশ নিয়ে সন্দেহ হলে ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) সে হাদীস বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকতেন|”
মুওয়াত্ত্বা হলো ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক সংকলিত সর্বপ্রথম হাদীস গ্রন্থ| মুওয়াত্ত্বার বিশুদ্ধতা ও তাঁর মর্যাদা সর্বসম্মতিক্রমে স্বীকৃত, আর সে কারণেই এর নাম ‘মুওয়াত্ত্বা’ রাখা হয়েছে| রসূলুল্লাহ (স.)-এর সহাবা ও তাবি‘ঈগণ যে সকল মাস্আলার ওপর ‘আমাল করেছেন ফাতাওয়া দিয়েছেন, সেই সকল মাস্আলার সমাধান মুওয়াত্ত্বায় সংকলিত হয়েছে| তাই একে ‘মুওয়াত্ত্বা’ নামে নামকরণ করা হয়েছে| ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) মুওয়াত্ত্বার কাজ সম্পন্ন করার পর মাদীনার বিখ্যাত ৭০ জন ফাক্বীহ ‘আলিমের সামনে পরীক্ষার জন্য পেশ করেন| তারা সকলেই এর সাথে ঐকমত্য পোষণ করেন| এজন্য তিনি এর নামকরণ করেন ‘মুওয়াত্ত্বা’|
ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) প্রায় লক্ষাধিক হাদীস যাচাই-বাছাই করে তার কিতাবটি ৪০ (চল্লিশ) বছর যাবৎ এর ওপর গবেষণা করে বিভিন্ন তথ্য সংযোজন-বিয়োজন করে নিজ হাতে লিপিবদ্ধ করেছেন|
শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবী (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতে, মুওয়াত্ত্বায় প্রথমে দশ হাজার রিওয়ায়াত বা বর্ণনা স্থান পেয়েছিল| পরে যাচাই বাছাই করে ১৮৪৪টি রিওয়ায়াত মুওয়াত্ত্বায় স্থান পেয়েছে| এতে মারফূ‘ হাদীস আছে ৬০০, মুরসাল ২৩৫, মাওকূফ ৬১৩, তাবি‘ঈনদের ক্বওল ও ফাতাওয়ার সংখ্যা ২৮৫, বালাগাতে মালিক ৫টি|
বিভিন্ন ছাত্র কর্তৃক বর্ণিত মুওয়াত্ত্বার ১৬টি সংকলন প্রসিদ্ধ| তন্মধ্যে তাঁর অন্যতম প্রিয় ছাত্র ইয়াহ্ইয়া কর্তৃক বর্ণিত সংকলনটি অতি প্রসিদ্ধ ও সমাদৃত| আমরা ‘হাদীস একাডেমি’ থেকে এ সংকলনটি প্রণয়ন করেছি|
গ্রন্থটি অনুসরণ করা হয়েছে মিসরের “দারু ইবনুল জাওযী”, “মাকতাবাতুস্ সফা” ও “দারুল হাদীস” লাইব্রেরি থেকে প্রকাশিত হাদীস গ্রন্থসমূহের|
গ্রন্থটির বিশেষত্ব হলো এই যে, এখানে প্রথমে নাবী (স.)-এর হাদীস, তারপর সহাবীদের কথা এবং এরপর তাবি‘ঈদের কুরআন হাদীসভিত্তিক ফাতাওয়া ক্রমানুসারে সাজানো হয়েছে|
এছাড়াও সানাদের বিচারে মুওয়াত্ত্বা মালিক-এর স্থান সবার উপরে| কারণ এখানে ইমাম মালিক থেকে মুহাম্মাদ পর্যন্ত তিনের অধিক কখনো হয়নি| এ গ্রন্থের একটি বিশেষ ˆবশিষ্ট্য হলো এখানে সহাবী, তাবি‘ঈ এবং তাবি তাবি‘ঈ পর্যন্ত একটি হাদীস বর্ণিত হওয়ার পর তা গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়েছে|
এ গ্রন্থটিতে য‘ঈফ হাদীস খুবই অল্প| তবুও জাতিকে হাদীসের সঠিক গ্রন্থ উপহার দেয়ার জন্য অনেক মুহাক্বিক্ব ‘আলিম এ গ্রন্থটির তাহক্বীক্ব করেছেন|
হাদীসের তাহক্বীক্বের ক্ষেত্রে ‘আল্লামাহ্ আলবানী (রহিমাহুল্লাহ)-এর কিতাব থেকে সহযোগিতা নেয়া হয়েছে, যেসব হাদীসে তার তাহক্বীক্ব ও তাখরীজ পাওয়া গেছে ফুটনোট আকারে তা নিচে দেয়া আছে| আর শায়খ হাফিয যুবায়র ‘আলী যাঈ (রহিমাহুল্লাহ)-এর তাহক্বীক্ব, তাখরীজ ও ফিক্বহ মাসায়িল নেয়া হয়েছে ইবনু ক্বাসিম সংকলিত তাঁর উর্দূ মুওয়াত্ত্বা মালিক থেকে যা মূল হাদীসের শেষে দেয়া হয়েছে|
অতএব যারা হাদীস, ফিক্হ ও ইসলামের প্রাথমিক যুগের বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করতে চান, তাদের জন্য মুওয়াত্ত্বা মালিক একটি অপরিহার্য অধ্যয়নসঙ্গী| আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে কুরআন ও সুন্নাহর সহীহ জ্ঞান অর্জন এবং সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফীক্ব দান করুন| আ-মীন|