অনশ্বর
গ্রামের গন্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর ক্ষেত্রে যাবার আহ্বান শুধু নয়,এর মধ্যে সময়োচিত একটি চিন্তা ও অনুভূতি অবিচল চিত্তে প্রকাশ করেছিলেন মানবপ্রেমিক ও সমাজসচেতন লেখক এই রচনায় – ‘”পশ্চিমবঙ্গে আর কিছু হবে না,উদ্বাস্তু বহু এসেচে,যেখানে সেখানে গাছতলায় মাঠে শ্মশানে পড়ে মরচে। কেউ তাদের দিকে তাকায় না। কদিন ওদের এমন কষ্ট ভোগ করতে হবে কে জানে? যা নেবার ওরাই নিক বাংলাদেশ থেকে। না নিলে ওরা খাবে কি? শ্যামকে নিয়ে সে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে এসেচে,এতটুকু পশ্চিমবঙ্গে আর কুলোবে না সব বাঙালীর। বাইরে বেরিয়ে পড়তে হবে বাংলার লোকের।
অথৈ জল
শশাঙ্ক মুখার্জি গ্রামাঞ্চলের এক পাড়াগায়ের বিখ্যাত ডাক্তার । পাশাপাশি দুইটা গ্রামে তার চেম্বার। ইচ্ছা করলে শহরে গিয়ে বড় চাকরি করতে পারতেন কিন্তু পৈতৃক ভিটা ছেড়ে যাননি,লোকের সেবা করার ব্রত নিয়েছেন। সংসারের অবস্থা খুবই ভালো,একটা মোটর গাড়ি কেনার কথাও ভাবছেন। এনার আরেকটা পরিচয় আছে ইনি তার গায়ের মাথা,ডানহাত সবই। এক অর্থে উনিই সিদ্ধান্ত নেবেন,উনিই বাস্তবায়ন করবেন। সবাই একবাক্যে মেনেও নেয় তাকে। শশাঙ্ক ডাক্তার খুব নীতিবান মানুষ,অন্যায় দু চক্ষে সহ্য করতে পারেন না। তাইতো,যখন গ্রামের এক বিধবা মেয়ে বিপত্নীক একজন লোকের সাথে অবৈধ সম্পর্ক তৈরি করলো তিনি কোনোকিছু না ভেবে রাগ ও ঘৃনার সাথে তাদের বিধান দিয়ে দিলেন,বিন্দুমাত্র মায়াদয়া দেখালেন না গর্ভবতী মেয়েটার প্রতি। শশাঙ্ক ডাক্তারের চরিত্র এমন খাঁটি যে শহরে থেকে কলেজে পড়ার সময়েও কোন তরুনীর দিকে চোখ তুলে তাকাননি স্ত্রী ছাড়া আর কোন নারীকে তিনি জানেননি। এই শশাঙ্ক ডাক্তারের জীবনে প্রেম এলো। গায়ের পালাতে খেমটা নাচ দিতে প্রতিবছরই মেয়েরা আসে,শশাঙ্ক ডাক্তার এসব দেখতেও যান না। এবার অসৎ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে দেখতে গিয়ে পান্না নামের একটা মেয়ের সাথে পরিচয় হলো তার। মেয়েটাকে দেখামাত্র তার কি যেন হয়ে গেলো,কিছুতেই তার নীতিতে তিনি অটল থাকতে পারছেন না,মনকে বোঝাতে পারছেন না যে এসব ঠিক না।
দম্পতি
গ্রাম্যজীবনে অভ্যস্ত গদাধর একজন পাটের আড়তদার। সহধর্মিণী অনঙ্গকে বিয়ে করে যখন ঘরে আনেন তখন অনঙ্গের বয়স মাত্র তেরো। সেই থেকে কুড়ি পেরিয়ে যাওয়া অনঙ্গকে দেখে ছাব্বিশ-সাতাশের গদাধর বর্তমানেও বিমোহিত থাকে। কিংবা বলা চলে থাকতো। গ্রামীণ জীবনের পাট চুকিয়ে একটা সময় সংসার নিয়ে কলকাতায় পারি জমালো গদাধর। তাদের সাথে আড়তের মুহুরী এবং গদাধরের বাবার আমলের অত্যন্ত বিশ্বস্ত কর্মচারী ভড়মশাই। কলকাতার দিনকাল মন্দ চলছিল না। অনঙ্গ-গদাধরের সুখের সংসারের দুষ্ট-মিষ্টি খুনসুটি কলকাতার যান্ত্রিকতাতেও স্বস্তির শ্বাস নিতে দিচ্ছিলো। কিন্তু তা খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। গ্রামের বন্ধু শচীন এবং আরেক পরিচিত নির্মলের সহচর্যে গদাধরের পরিচয় হয় অন্য আরেকটি দুনিয়ার সাথে। গদাধরের সামনে আসেন সেসময়ের নামী অভিনেত্রী শোভারাণী মিত্র। এতকাল অবধি গ্রামীণ নারীর সরলতা,আতিথেয়তা আর বিনম্রতার কুণ্ঠিত স্পর্শে থেকে শহুরে শিক্ষিতা-আত্মমর্যাদায় প্রত্যয়ী নারীর স্বরূপ যেন গদাধরকে বিস্ময়ের ঘূর্ণিপাকে ফেলে দিলো।