সমাজকে আমরা সভ্যতার কাঠামোয় যতই মুড়ে রাখি না কেন, এর অভ্যন্তরে কিছু অন্ধকার অধ্যায় দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট হয়ে থাকে, কিন্তু আমরা স্বেচ্ছায় চোখ বন্ধ করে থাকি। পতিতাবৃত্তি তেমনই এক গভীর ক্ষত, যা মানব সভ্যতার শুরু থেকে বহমান হলেও, কোনো সমাজই তাকে সম্মানজনক স্বীকৃতি না দিয়ে শুধু আড়াল করে রাখার ভান করেছে। 'নীলকণ্ঠী' আমার সেই অন্ধকারের দিকে আলো ফেলার এক নিবেদন।
এই বইটি লিখতে গিয়ে আমি নিছক তথ্য সংগ্রহ করিনি, আমি গভীর এক নীরব আর্তনাদ শুনেছি। আমি দেখেছি রুপা, জবা-এর মতো নারীদের হৃদয়বিদারক জীবন—কীভাবে নারীত্বের স্বাভাবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে, প্রতারিত হয়ে, কিংবা সমাজের কাঠিন্যের শিকার হয়ে তারা এই নিষিদ্ধ জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। তাদের ব্যক্তিগত আখ্যানগুলি আমাকে শিখিয়েছে যে, এটি কেবল একটি পেশা নয়, বরং সামাজিক বঞ্চনা, অসহায়ত্ব এবং পুরুষের লালসার এক সম্মিলিত ফল। এই নারীদের করুণ জীবন আমাকে বাধ্য করেছে কলম ধরতে, কারণ মানবিক সংযোগ ছাড়া এই সমস্যার গভীরে প্রবেশ করা সম্ভব নয়।
আমার কাজ কেবল বর্ণনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। আমি ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখেছি এই প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে যুগ যুগ ধরে টিকে আছে। প্রাচীন ব্যাবিলনের দেবদাসী প্রথা থেকে শুরু করে কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র', ইউরোপের মধ্যযুগ এবং আধুনিক বাংলাদেশের আইনি ও সামাজিক বিশ্লেষণ আমাকে এটাই প্রমাণ করেছে যে, এটি নিছক ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এই গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ পাঠকের সামনে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব তুলে ধরবে বলেই আমার বিশ্বাস।
'নীলকণ্ঠী' প্রকাশের মধ্য দিয়ে আমি পাঠকের সামনে একটি আয়না তুলে ধরতে চেয়েছি। এই আয়না আমাদের সমাজের দ্বিচারিতা, নৈতিক ভণ্ডামি এবং মানবিক বঞ্চনার দিকটি দেখাবে। আমি আশা করি, এই গ্রন্থ নিষিদ্ধ পল্লীর নারীদের প্রতি ঘৃণা নয়, বরং গভীর সহমর্মিতা ও সমাধানের পথ খুঁজতে আমাদের উদ্বুদ্ধ করবে। এই নীরব আর্তনাদকে আর কতদিন আমরা উপেক্ষা করব?
এই গ্রন্থটি যদি সমাজের বিবেককে সামান্যতম নাড়া দেয় এবং সমাধানের পথে এক কদমও এগিয়ে যেতে সাহায্য করে, তবেই আমার পরিশ্রম সার্থক হবে।
কাজী মুহাম্মদ খলিলুর রহমান