১৯৩৩ সালের আগস্ট, এই তিন বছরের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন কারাগারে (বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ) লিখিত হয়েছিল| ভারতের স্ধীবানতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ এবং ভারতে ব্রিটিশ শাসনামল প্রতিরোধ করবার অপরাধে গ্রন্থকার তখন কারাজীবন যাপন করেছিলেন|
পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, তাঁর এই অবশ্য বিশ্রামের—তাঁর নিজের ভাষায়, ‘অবকাশ ও নির্লিপ্তির’ সংযোগ গ্রহণ করেন এবং বিশ্ব-ইতিহাস সম্পর্কে লিখতে আরম্ভ করেন| তাঁর কন্যার উদ্দেশ্যে লিখিত পত্রাকারে তিনি এই রচনা করেছিলেন, কারণ প্রায়ই কারাগারে রুদ্ধ থাকার ফলে এই কন্যার শিক্ষার তত্ত্বাবধান করার কোনো সংযোগ তাঁর ছিল না|
১৯৩৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তারিখে পুনরায় ধৃত হয়ে ‘রাজদ্রোহের’ অপরাধে দুই বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবার পূর্বে পণ্ডিত নেহরু যখন অত্যল্পকালের জন্য অবকাশ পেয়েছিলেন, তখন তিনি এই পত্রগুলো একত্রিত করেন| অতঃপর ১৯৩৪ সালে তাঁর ভগ্নী মাননীয়া শ্রীমতী বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত * * * এই পত্রগুলোকে (বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ) নামে বই আকারে প্রকাশ করবার ব্যবস্থা করেন|
নামকরণ যথোপযুক্তই হয়েছে| পুস্তকের বিষয়বস্তুর পরিচিতির পক্ষে এই নামটির ব্যঞ্জনা যথেষ্ট| * * *
১৯৩৬ সালে মুক্তিলাভের পর পুনরায় পণ্ডিত নেহরু রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করতে থাকেন| এর পর কর্মব্যস্ততা, দায়িত্ব এবং দুর্ভাগ্যবশত, পারিবারিক বিয়োগ-বেদনায় তাঁর আর অবকাশ থাকে না| ভারতেও ঘটনাবলি তীব্রতা ও ত্বরার সহিত অগ্রসর হতে থাকে| ইউরোপ তথা পৃথিবীতে বিরাট পরিবর্তন ও যুগান্তকারী ঘটনাসমূহ পরিলক্ষিত হয়| পণ্ডিতজি ভাবী সভ্যতার পক্ষে অর্থময় এসব ঘটনার দর্শকমাত্র ছিলেন না, সেগুলোতে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণও করেছিলেন| কেন না, পণ্ডিত নেহরু সেই বিরল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন জননায়কদের অন্যতম, যাঁদের মধ্যে উদ্দাম কর্মতৎপরতার সঙ্গে দৃষ্টির প্রসারতা ও নিস্পৃহতার সমš^য় ঘটিয়াছে| ইউরোপ ভ্রমণকালে পণ্ডিতজী পাশ্চাত্য জগতের কিছু সাম্প্রতিক ঘটনা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করেছিলেন| তিনি চীন ও স্পেনের সংগ্রামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এসেছিলেন|
বর্তমান সংস্করণটিকে অনেকদিক হতে একটি নতুন বই বলা চলে, ¯^য়ং গ্রন্থকার কর্তৃক এ সংশোধিত, বহুল পরিমাণে পুনলিখিত এবং ১৩৩৮ সালের শেষ পর্যন্ত ঘটনাসংবলিত করা হয়েছে| এই কাজগুলো তিনি কারাগারের বাইরে করলেও এতে মূল রচনার ˆনর্ব্যক্তিক নিরপেক্ষতা বিন্দুমাত্রও ব্যাহত হয়নি| বরং এই অধিকতর অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের অবদানে সমৃদ্ধ হয়েছে|
(বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ) ঘটনার বিবরণী মাত্র নয়| বিবরণের দিক হতে এটি যেমন মূল্যবান, তেমনি লেখকের ব্যক্তিত্বের ছাপও এতে বর্তমান| তাঁর অসাধারণ মনীষা ও অনুভূতিপ্রবণ মন এই ইতিহাস গ্রন্থকে অনন্যসাধারণ করে তুলেছে| বর্ধিষ্ণু, শিশুর উদ্দেশে লিখিত পত্রের আকারও এতে ক্ষুণ্ন হয়নি| এর আবেদন সরল এবং ঋজু : কিন্তু বিষয়বস্তুর আলোচনা কোথাও অগভীর নয়| ঘটনার বিবৃতি বা তাৎপর্য বিশ্লেষণ কোথাও অতিমাত্রায় সরলীকৃত হয়নি| * * *