সাহিত্যের সব শাখার মধ্যে কবিতা সবচেয়ে অন্তরঙ্গ-সমৃদ্ধ-সুন্দর শাখা। হৃদয়ের সঙ্গে কবিতার যোগসূত্রিতা খুবই নিবিড়। কবিতা হৃদয়ানুভূতির ছন্দময়-সংগীতময় প্রকাশ। নানা জন নানাভাবে কবিতাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। ইংরেজ কবি ওয়ার্ডওয়ার্থের (১৭৭০-১৮৫০ খ্রি.) ভাষায়- Poetry is the spontaneous overflow of power feelings. তবে এ হৃদয়োৎসারিত ভাব-কল্পনা প্রকাশের জন্য অনিবার্য শব্দের অবশ্যম্ভাবী বাক্যবিন্যাস অপরিহার্য। এ কারণেই আরেক ইংরেজ কবি স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজ (১৭৭২-১৮৩৪ খ্রি.) বলেন, Poetry is the best words in the best order. সর্বোত্তম শব্দের সুবিন্যস্ত প্রয়োগই কবিতার মাঝে ছন্দ তরঙ্গের সৃষ্টি করে। ইতালির দার্শনিক কবি দান্তে (১২৬৫-১৩২১ খ্রি.) তাই বলেন, 'সুরে বাঁধা কথাই কবিতা।' অন্যভাবে বলতে হয় কবিতা এক ধরনের musical thought. এ তো গেল কবিতার বিধিবদ্ধ সংজ্ঞা। তবে কখন কী যে কবিতা হয়ে ওঠে তা বলা মুশকিল। আধুনিক বাংলার প্রভাবশালী কবি আল মাহমুদ (১৯৩৬-২০১৯ খ্রি.) বলেন, 'কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুল খোলা আয়েশা আক্তার।' আবার কালপরিক্রমায় প্রমথ চৌধুরির (১৮৬৮-১৯৪৬ খ্রি.) একটি বাক্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ- 'এ যুগের সাহিত্য রাজধর্ম ত্যাগ করে গণধর্ম অবলম্বন করেছে।' সুতরাং কবিতা এখন রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে সবুজের বিস্তৃত প্রাঙ্গণে শোভিত হচ্ছে অসাধারণ প্রদীপ্তিতে। তাই কবিতা লুইপা, বিরুবাপা, গুগুরীপা... বড়ুচণ্ডী দাস, বিদ্যাপতি... চণ্ডীদাস, শাহ্ মুহাম্মদ সগীর, দৌলত উজির বাহরাম খাঁ, মাইকেল মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, ফররুখ, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, জসীম উদ্দীন, ওমর আলী হয়ে তরুণ কবি ইমরান নাজিরের আরাধ্য অতঃপর স্বোপার্জিত। এ তরুণ কবির প্রায় সব কবিতা ছড়াধর্মী; যা কিনা বাংলা সাহিত্যের আদি রূপ। তবে এখানে নিয়মকানুন মেনে কবি নিজের পারঙ্গমতার পরিচয় দিতে পেরেছেন। ছন্দের ফ্রেমে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কবিতাও তিনি এ কাব্যগ্রন্থে বিযুক্ত করেছেন। যাতে সহজ বক্তব্য ও চিত্রময়তা বেশ সুন্দরভাবে পরিলক্ষিত। তার সুকোমল উচ্চারণ, ঝরঝরে বর্ণনা পাঠকের মনে সহেলি আনন্দ দেবে বলে আমার বিশ্বাস। কবির জন্য আমার প্রার্থনা যে,
'তুমি ওঠে এসো, ওঠে এসো মাঝি মাল্লার দলে,
দেখবে তোমার কিস্তি আবার ভেসেছে সাগর জলে।'
কবির সুস্বাস্থ্য কামনা এবং বইটির বেশুমার কাটতির প্রত্যাশায়-
ফরিদ ফারুক
কবি ও অধ্যাপক